গুপ্তবংশীয় নৃপতি রামগুপ্ত’র উপস্থিতি প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসবিদরা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে ভ্রাতৃঘাতী আখ্যা দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কেন? কি সেই ষড়যন্ত্র? পদ্মাবতী রাজকন্যা ধ্রুবদেবীই বা কি ভাবে জড়িয়ে পড়লেন সেই ষড়যন্ত্রে? সংস্কৃত নাট্যকার বিশাখদত্ত রচিত, প্রায় অবলুপ্ত নাটক ‘দেবী চন্দ্রগুপ্তম্’ নাটকের উদ্ধারপ্রাপ্ত তেরোটি শ্লোক এবং সে সময়ের যতটুকু ইতিহাস জানা যায়, তার উপর ভিত্তি করেই রচিত এই নাটক। সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত’র মাঝের কিছুটা সময় এ নাটকের মূল স্রোত। সে সময়ের সব তথ্য যে অভ্রান্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, তেমন নয়। যতটুকু পাওয়া যায়, আমরা সে সবের মধ্যে থেকে মূল নির্যাসটুকু আহরণ করে নাটকের আকারে গাঁথার চেষ্টা করেছি মাত্র।
আমরা বিশ্বাস করি, যে ‘মুদ্রারাক্ষস’এর প্রণেতা বিশাখদেব বা বিশাখদত্ত যদি আর কিছু না লিখে শুধু ঐ একটি নাটকই লিখে যেতেন, তবুও আজ তাঁর নাম সমভাবেই উচ্চারিত হত। কিন্তু তিনি ‘দেবী চন্দ্রগুপ্তম্’ নামে আরও একটি নাটক লিখলেন, যা আরও বেশী বিতর্কের জন্ম দিল, আরও বেশী চর্চার জন্ম দিল। দুঃখের বিষয়, যে এই নাটকটি তার সম্পূর্ণ শরীরে পাওয়া যায় না। গবেষকেরা এর মাত্র তেরোটি খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করতে পেরেছেন। ‘নাট্যদর্পণ’ গ্রন্থে ছ’টি অংশের শ্লোক পাওয়া যায়, তিনটি অংশ ‘শ্রী ভোজ’এর ‘শৃঙ্গার প্রকাশ’ ও বাকি চারটি অংশ তাঁরই ‘সরস্বতী কণ্ঠভরণ’এ পাওয়া যায়। সেই খণ্ডিত অংশ সমুদয় একত্র করলে যে গল্পাংশ পাওয়া যায়, তা তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর তাতেই যত আকর্ষণ, তাতেই যত বিতর্ক। এ প্রসঙ্গে অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে ‘সংবিদ’ প্রকাশনীর ‘দেবী-চন্দ্রগুপ্ত কথা’ পড়ে দেখার অনুরোধ রইল।
খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, সমুদ্রগুপ্ত’র অব্যবহিত পর, ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত’র সিংহাসন আরোহণের আগে, খুব অল্প সময়ের জন্য রামগুপ্ত নামে আর একজন গুপ্তসাম্রাজ্যের প্রতিভূ হিসাবে সিংহাসনে উপবেশন করেছিলেন। যিনি ছিলেন সমুদ্রগুপ্ত’র ঔরসে এক দাসীর গর্ভজাত সন্তান। তিনি পশ্চিমী শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসিংহ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সন্ধিশর্ত অনুযায়ী নিজের স্ত্রী ধ্রুবদেবী’কে তার হাতে তুলে দিতে সম্মত হন। বিষয়টি চন্দ্রগুপ্ত জানার পর, তিনি নিজে প্রথমে ধ্রুবদেবীর ছদ্মবেশে রুদ্রসিংহ’র শিবিরে গিয়ে তাকে হত্যা করেন, ও পরে ফিরে এসে অগ্রজ রামগুপ্তকেও হত্যা করে সিংহাসনের অধিকার গ্রহণ করেন। এটুকুই ঘটনা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে, এই সামান্য ঘটনা অসামান্য গুরুত্ব বহন করে। সেদিনও করেছিল। আজও করে।